রিচুয়ালীটি অস্বীকার করা হল পাত্র ছাড়াই পানি আনার নামান্তর

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
রিচুয়ালীটি অস্বীকার করা হল পাত্র ছাড়াই পানি আনার নামান্তর

মরুভূমির বুক চিরে হেঁটে যাওয়া একজন পথিককে কল্পনা করুন। তার কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ, ঠোঁটে ফেটে চৌচির, প্রাণপণে সে খুঁজছে পানি। অবশেষে সামনে একটি মরুদ্যান। ঝলমলে স্বচ্ছ পানির উৎস। কিন্তু হাতে নেই কোনো পাত্র — না কোনো মশক, না কোনো ঘটি, না কোনো কুঁজো। পথিক দু'হাতের আঁজলায় পানি তুলে দৌড়াতে চাইছে, কিন্তু পানি বেরিয়ে যাচ্ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে, মাটিতে পড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে বালির বুকে। পানির অস্তিত্ব আছে, কিন্তু ধারণ করার সামর্থ্য নেই। পরিণতি — তৃষ্ণা মেটে না, যাত্রা অসম্পূর্ণ থাকে, এবং মরুভূমির মাঝেই মৃত্যু।

এই উপমাটি নিছক একটি সাহিত্যিক রূপক নয়। এটি আমাদের সময়ের এক ভয়াবহ বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক সংকটের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সেই সংকটের নাম — 'কুরআনবাদ' বা 'আহলে কুরআন' আন্দোলন, যারা ইসলামের সুনির্দিষ্ট রিচুয়াল, সুন্নাহ ও হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করে কেবল কুরআনকে আঁকড়ে ধরার দাবি করে। আপাতদৃষ্টিতে এই দাবি যতটা আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, বাস্তবে এটি পানির পাশে দাঁড়িয়েও পাত্র ছাড়াই পানি আনার মতো এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা।

কুরআনবাদ — একটি আধুনিক বিভ্রান্তির শিকড়

'কুরআনবাদী' বা 'Quranist' আন্দোলনের উদ্ভব মূলত উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ভারতে। তারপর থেকে পশ্চিমা বিশ্বের নানা কোণায় এবং ইন্টারনেটের বিস্তৃতির সাথে সাথে ডিজিটাল মাধ্যমে এই মতবাদ একটি আধুনিক, 'যুক্তিবাদী' ইসলামের বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে। তাদের কেন্দ্রীয় দাবি হলো:

প্রথমত, কুরআনই একমাত্র প্রামাণিক ওহী এবং দ্বীনের একমাত্র উৎস। দ্বিতীয়ত, হাদীস মানব-রচিত, তাই তা অনুসরণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, সালাত, সিয়াম, হাজ্জ ইত্যাদির নির্দিষ্ট বাহ্যিক কাঠামো কুরআনে সরাসরি বর্ণিত নয়; অতএব তা বাধ্যতামূলক নয়। চতুর্থত, কেবল আল্লাহর স্মরণ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধই যথেষ্ট।

এই চিন্তাধারার বাহ্যিক চাকচিক্য রয়েছে নিঃসন্দেহে। "শুধু কুরআন মানি" — কথাটি শুনতে যতটা সরল ও পরিশীলিত লাগে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক মারাত্মক অর্থনৈতিক ফাঁকি। কারণ এই দাবির অর্থ হলো — মানচিত্র পকেটে রাখব, কিন্তু পথ চলব না; রেসিপি মুখস্থ করব, কিন্তু রান্না করব না; জলের উৎস চিনব, কিন্তু পাত্র নেব না।

পাত্রের উপমায় রিচুয়ালের অপরিহার্যতা

পানি হলো জীবনের উৎস। এটি ছাড়া কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না। কিন্তু পানির যত মহিমাই থাকুক, পাত্র ছাড়া তা মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। এখানে তিনটি অনুষঙ্গ অবিচ্ছেদ্য:

পানি— ইসলামের মূল সত্য, তাওহীদ ও আল্লাহর সাথে সম্পর্কের অমিয় ধারা।
পাত্র — রিচুয়াল, সুন্নাহ, ইবাদতের নির্দিষ্ট কাঠামো।
তৃষ্ণার্ত পথিক — মুমিন বান্দা, যার আত্মার পরিশুদ্ধি ও মুক্তি দরকার।

পাত্র যদি না থাকে, তাহলে পানি আছে বটে — কিন্তু ব্যবহারযোগ্য নয়। পানি যদি না থাকে, তাহলে পাত্র আছে বটে — কিন্তু নিষ্প্রাণ। ঠিক তেমনি:

রিচুয়াল যদি না থাকে, তাহলে ইসলামের সত্য আছে বটে — কিন্তু জীবনে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। আর রিচুয়াল থাকলে কিন্তু আন্তরিক ঈমান না থাকলে সেটা হয় শূন্য পাত্র বহনের মতো নিষ্ফল পরিশ্রাম।

কুরআনবাদীরা দাবি করেন — "পানিটুকু হলেই হবে, পাত্র লাগবে না।" কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাত্র ছাড়া সেই পানি আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে যায়। সংসারে কার্যকর হয় না, উপকারে আসে না, তৃষ্ণা মেটায় না। সমাজে প্রয়োগযোগ্য হয় না, উম্মাহর মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে পারে না, ব্যক্তিজীবনে কোনো শৃঙ্খলা আনে না।

আল্লাহর বিধান — সুনির্ধারিত পাত্রের নির্দেশ

এটি কোনো মানবিক উদ্ভাবন নয় যে ইসলামে রিচুয়াল থাকবে। স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই রিচুয়ালের কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং কুরআনেই তার ঘোষণা দিয়েছেন। কুরআনবাদীরা দাবি করেন কুরআনই তাদের সব, অথচ কুরআনই তাদের দাবির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-হাজ্জে স্পষ্ট করে বলেছেন:

"আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য ইবাদতের নিয়ম (মানসাক) নির্ধারণ করে দিয়েছি, যা তারা পালন করে। সুতরাং তারা যেন এই ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক না করে..."
— সূরা আল-হাজ্জ: ৬৭

এই আয়াতে আরবি শব্দ মানসাক' (منسك) ব্যবহৃত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থই হলো ইবাদতের আচার-অনুষ্ঠান বা রিচুয়াল। এটি সুনির্দিষ্ট পাত্রের মতো, যা আল্লাহ নিজেই তৈরি করে দিয়েছেন মানুষের হাতে তুলে দিতে। কোনো 'যুক্তিবাদী' মানুষ নিজের পছন্দমতো পাত্র বানিয়ে নেবে — এই স্বাধীনতা এখানে নেই।

আবার সূরা আল-মায়েদাহতে ঘোষণা করা হয়েছে:

"তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি শরিয়ত ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।"
— সূরা আল-মায়েদাহ: ৪৮

'শরিয়ত' মানে কেবল কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; শব্দটির মূল অর্থ হলো পানির দিকে যাওয়ার পথ — **الشِّرْعَةُ** বা **الشَّرِيعَةُ**। অর্থাৎ পানির উৎসের দিকে পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত পথ, নির্ধারিত পদ্ধতি। এই পথ ছেড়ে দিলে পানির কাছে পৌঁছানো অসম্ভব।

একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ শতাধিকবার এসেছে। কিন্তু 'কীভাবে' সালাত পড়তে হবে — কয় রাকাত, কোন সূরা, রুকু-সেজদার পদ্ধতি — তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নেই। কুরআনবাদী যদি সত্যিই শুধু কুরআন মানে, তাহলে সে কীভাবে সালাত পড়বে? উত্তর হলো — পড়তে পারবে না। তার পাত্র নেই। কুরআন তাকে বলেছে পানি আনতে, কিন্তু পাত্রটি দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর সুন্নাহ ও রিচুয়ালের মাধ্যমে। পাত্র ফেলে দিলে পানি আনার নির্দেশটিই অকার্যকর হয়ে যায়।

শা'আইরুল্লাহ — আল্লাহর নিদর্শনরূপী পাত্রসমূহ

আল্লাহ তায়ালা ইসলামের বাহ্যিক রিচুয়ালগুলোকে শুধু নিয়ম হিসেবে রাখেননি, বরং এগুলোকে **'শা'আইরুল্লাহ' (شعائر الله)** বা 'আল্লাহর নিদর্শন' আখ্যা দিয়েছেন। এই শব্দটি নিজেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 'শা'আইর' মানে প্রতীক বা চিহ্ন, যা কোনো বৃহত্তর সত্যের দিকে নির্দেশ করে এবং একটি সভ্যতার পরিচয় বহন করে।

আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন:

"এটাই হলো আল্লাহর বিধান; এবং কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে (শা'আইরুল্লাহ) সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।"
— সূরা আল-হাজ্জ: ৩২

এই আয়াতটি একটি অপ্রতিরোধ্য যুক্তি স্থাপন করে। রিচুয়াল বা বাহ্যিক ধর্মীয় আচারকে সম্মান করা কেবল নিয়ম মানা নয় — এটি তাকওয়ার, অর্থাৎ অন্তরের খোদাভীতির বহিঃপ্রকাশ। উল্টোদিকে, রিচুয়ালকে যারা তুচ্ছ করে — "এসব বাহ্যিক কাজের দরকার নেই, আমি মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করি" — কুরআনের মাপকাঠিতে তাদের তাকওয়াই প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের দাবিকৃত আধ্যাত্মিকতা পাত্রহীন পানির মতো — বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, মাটিতে মিলিয়ে যায়, কোনো প্রাণ বাঁচায় না।

রিচুয়াল এবং উম্মাহর ঐক্য — একটি পাত্রে কোটি মানুষের পানি

ইসলামের রিচুয়ালের আরেকটি অপরিহার্য মাত্রা হলো সামাজিক ও সভ্যতাগত। এই রিচুয়ালগুলো কেবল ব্যক্তির আত্মার সংস্কার করে না, সমগ্র উম্মাহকে একটি সংহত, পরিচিহ্নিত সমাজব্যবস্থায় আবদ্ধ রাখে।

যখন পৃথিবীর একপ্রান্তের বাংলাদেশী মুসলমান আর অন্যপ্রান্তের নাইজেরিয়ান মুসলমান একই সময়ে ফজরের সালাতে দাঁড়ায়, একই নিয়মে রুকু করে, একই ভাষায় সূরা ফাতিহা পাঠ করে — তখন তাদের মধ্যে যে অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়, তা দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা বা দার্শনিক তত্ত্ব তৈরি করতে পারে না। এটি একটি অভূতপূর্ব পাত্র — কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর পাত্র।

আল্লাহ তায়ালা এই ঐক্যের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন:

"এবং তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ো না..."
— সূরা আলি ইমরান: ১০৩

'হাবলিল্লাহ' বা 'আল্লাহর রজ্জু' মানে কুরআন এবং সুন্নাহর সম্মিলিত রশি। এই রশির একটি অংশ হলো তাত্ত্বিক বিশ্বাস (আকিদা), আর অন্য অংশ হলো ব্যবহারিক রিচুয়াল (আমল)। দুটো অংশই থাকলে রজ্জু মজবুত। একটি অংশ কেটে দিলে রজ্জু ছিঁড়ে যায়, উম্মাহ বিচ্ছিন্ন হয়।

কুরআনবাদীরা যখন বলে "রিচুয়াল দরকার নেই, প্রত্যেকে নিজের মতো করে আল্লাহকে স্মরণ করুক", তখন পরিণতি কী হয়? পঞ্চাশজন মানুষ পঞ্চাশটি ভিন্ন পদ্ধতিতে 'ইসলাম' পালন করতে শুরু করে। কেউ বলে দিনে একবার ধ্যানই সালাত, কেউ বলে রোজার বদলে দানই যথেষ্ট, কেউ বলে হাজ্জ একটি পৌত্তলিক প্রথা। এই বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে উম্মাহকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয় — পাত্র ছাড়া পানির মতো, প্রতিটি ফোঁটা আলাদাভাবে মাটিতে শুষে যায়, সমষ্টিগতভাবে কোনো কাজেই আসে না।

ইতিহাসের দর্পণে রিচুয়াল-বিমুখতার পরিণতি

ইতিহাস বলছে, যখনই কোনো জাতি বা গোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় রিচুয়াল ও কাঠামোগত ইবাদত ছেড়ে দিয়েছে, তাদের আধ্যাত্মিক পরিচয় দ্রুত বিলুপ্ত হয়েছে। আন্দালুসের মুসলমানরা যখন ধর্মীয় অনুশীলন থেকে দূরে সরে গেল, তারা মাত্র কয়েক প্রজন্মের মধ্যে মূলধারার ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে মিলিয়ে গেল। মিশরের খ্রিষ্টান কপ্টিক সম্প্রদায় যুগের পর যুগ ধরে তাদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় রিচুয়াল আঁকড়ে ধরে বলেই আজও তারা একটি পরিচিহ্নিত জাতিসত্তা হিসেবে টিকে আছে।

রিচুয়াল কোনো জাতির পরিচয়কে ধারণ করে রাখে। এটি সেই পাত্র, যা না থাকলে পানি শুকিয়ে যায়, জাতির পরিচয় বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ইসলামের চৌদ্দশ বছরের অস্তিত্ব এবং বিশ্বব্যাপী ১৮০ কোটি মুসলমানের ঐক্য — এটি কোনো নিছক দার্শনিক তত্ত্বের ফসল নয়। এই ঐক্য ধরে রেখেছে সালাত, সিয়াম, জাকাত ও হাজ্জের অবিভাজ্য রিচুয়াল কাঠামো।

 'পাত্র ছাড়া পানির' মনোবৈজ্ঞানিক ব্যর্থতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানও এই বিষয়ে কথা বলে। মানুষের মানসিক শৃঙ্খলা ও আত্মিক উন্নয়নের জন্য Ritual বা নিয়মিত আচারের গুরুত্ব এখন গবেষণা-প্রমাণিত। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নামাজে দাঁড়ানো মানুষের মস্তিষ্কে একটি সুনির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি করে — বিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন 'Habit Loop' বা 'Temporal Landmark'। রমজানের রোজার নির্দিষ্ট সময়সূচি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ায় — এটি এখন নিউরোসায়েন্সের ভাষায় প্রমাণিত।

যে মানুষটি বলে "আমি মনে মনেই আল্লাহকে স্মরণ করি, পাঁচওয়াক্ত সালাতের দরকার নেই", সে আসলে নিজের আত্মার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলার পাত্রটিকেই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। ফলে 'মনে মনে স্মরণ' ধীরে ধীরে কমে আসে, একদিন মিলিয়ে যায়। ঠিক যেমন পাত্রহীন হাতের পানি একটু একটু করে ঝরে, শেষে হাত শুকিয়ে যায়।

রাসুল্লাহ ﷺ — পাত্র তৈরির কারিগর

আল্লাহ কুরআনে পানির কথা বলেছেন। কিন্তু পাত্রটি তৈরি করে মানবজাতির হাতে তুলে দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ মুস্তফা ﷺ। এই পাত্রের নাম — সুন্নাহ। তিনি নিজে সালাত পড়ে দেখিয়েছেন, রোজা রেখে শিখিয়েছেন, হাজ্জ করে বলেছেন —

"তোমরা আমার কাছ থেকে হাজ্জের নিয়ম শিখে নাও।"
— সহিহ মুসলিম

এই কথাটির মধ্যে নিহিত আছে পাত্র তৈরির গোটা দর্শন। আল্লাহ হাজ্জের নির্দেশ দিয়েছেন কুরআনে। কিন্তু হাজ্জের প্রতিটি রিচুয়াল — তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ, আরাফার ময়দানে অবস্থান, মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ — এই পাত্রগুলো রাসুল ﷺ নিজে বহন করে দেখিয়েছেন। এই পাত্র ছাড়া আল্লাহর পানীয় কীভাবে পান করবে মানুষ?

যারা এই পাত্রকে অস্বীকার করে, তারা নবীকে অস্বীকার করছে। আর নবীকে অস্বীকার করলে কুরআনকে অস্বীকার করা হয়, কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন:

রাসুল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলে তা থেকে বিরত থাকো।"
— সূরা আল-হাশর: ৭

এই আয়াতটি কুরআনবাদীদের মুখের সামনে রাখা সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। কুরআন নিজেই রাসুলের সুন্নাহকে অনুসরণ করতে বলছে — এটি কুরআনের নির্দেশ। তাহলে সুন্নাহ অস্বীকার করা মানে এই কুরআনের আয়াতকেই অস্বীকার করা।

পাত্রের প্রকারভেদ — রিচুয়ালের বহুমাত্রিক ভূমিকা

ইসলামের রিচুয়াল বা ধর্মীয় আচারগুলো একটি নয়, বরং বহু ধরনের পাত্র হিসেবে কাজ করে:

সালাত হলো দৈনন্দিন ব্যবহারের পাত্র — প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সাথে সংযোগের জীবন্ত সেতু। এই পাত্র ছাড়া ঈমানের পানি দিনে দিনে বাষ্পীভূত হয়।

সিয়াম হলো পরিশোধনের পাত্র — একমাসের সাধনায় নফসের ময়লা ছেঁকে নেয়, আত্মাকে পরিষ্কার করে।

জাকাত হলো বিতরণের পাত্র — সমাজের শুকিয়ে যাওয়া প্রান্তে পানি পৌঁছে দেয়, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

হাজ্জ হলো সম্মিলনের পাত্র — কোটি মানুষের তৃষ্ণা একসাথে মেটানোর মহাপাত্র, যেখানে উম্মাহর ঐক্য দৃশ্যমান হয়।

এই চারটি বৃহৎ পাত্রের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ছোট পাত্র — ওজু, গোসল, আজান, জামাতে সালাত, ঈদের নামাজ, জানাজা, নিকাহ-তালাকের নির্দিষ্ট পদ্ধতি। এই প্রতিটি পাত্র একটি সুনির্দিষ্ট কাজ করে, একটি বিশেষ তৃষ্ণা মেটায়। কুরআনবাদীরা এই সব পাত্র ভেঙে দিয়ে শুধু "পানি আছে" বলে আত্মতৃপ্তিতে থাকে — পানি বেরিয়ে যাচ্ছে তাও তারা দেখে না।

কুরআনবাদের আসল চেহারা — একটি সতর্কবার্তা

কুরআনবাদ আন্দোলনটির আরেকটি গভীরতর দিক রয়েছে, যা নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার। ইতিহাসবিদ ও ইসলামী গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, এই আন্দোলনের বেশিরভাগ মূল পৃষ্ঠপোষকতা এসেছে এমন মহল থেকে যারা মুসলিম উম্মাহকে ভেতর থেকে ভাঙতে চেয়েছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে 'হাদীস অস্বীকার' আন্দোলনকে পরোক্ষে মদত দেওয়া হয়েছিল উম্মাহর শক্তির উৎস — সুন্নাহ ও রিচুয়ালভিত্তিক সংগঠিত ইসলামকে — দুর্বল করতে।

যখন মুসলমান সংগঠিত, যখন তারা একই পাত্রে পানি পান করে, একই সময়ে একই নিয়মে সালাত পড়ে — তখন তারা একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি। আর যখন প্রত্যেকে নিজের পাত্র নিজে বানিয়ে নেয়, প্রত্যেকের ইসলাম আলাদা হয়ে যায়, তখন কোটি মানুষও বিচ্ছিন্ন বালুকণার মতো — শক্তিহীন, সংহতিহীন।

পাত্র ভাঙার এই চক্রান্ত চিনতে পারাটাই আজকের মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।

পাত্র ধরো, পানি পান করো, তৃষ্ণা মেটাও

ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা, যেখানে তত্ত্ব ও বাস্তবতা, আত্মা ও শরীর, ব্যক্তি ও সমাজ, বিশ্বাস ও আচরণ — সবকিছু এক অপূর্ব সমন্বয়ে গাঁথা। পানি ও পাত্র যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি ইসলামের রুহ ও রিচুয়ালকেও আলাদা করা যায় না।

কুরআনবাদীরা কুরআনের দোহাই দিয়ে কুরআনেরই নির্দেশিত পাত্রগুলো ভেঙে ফেলছে। তারা পানির উৎসের পাশে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণায় ছটফট করছে — কারণ পাত্র নেই। তাদের দার্শনিক কথামালা যতই সুন্দর হোক, তাদের আত্মার তৃষ্ণা মেটে না, তাদের সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় না, তাদের ইবাদত রূপ পায় না।

প্রকৃত মুমিনের কাজ হলো — পাত্র হাতে নিয়ে পানির কাছে যাওয়া। সেই পাত্রের নাম সালাত, সিয়াম, জাকাত, হাজ্জ। সেই পাত্র বানিয়েছেন আল্লাহ, তৈরি করে হাতে দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। এই পাত্র ধরো, পানি পান করো, তৃষ্ণা মেটাও — এবং অপরের কাছেও পৌঁছে দাও। এটাই ইসলামের সত্যিকারের পথ, এটাই আল্লাহর নির্ধারিত শরিয়ত, এটাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো সুন্নাহ।

আমি তোমাদের মাঝে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা এই দুটো আঁকড়ে ধরে থাকবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার ইতরাত।"
— মুওয়াত্তা মালিক

পানি আর পাত্র — কুরআন আর সুন্নাহ। এই দুটো অবিচ্ছেদ্য। যে এই সত্য বোঝে, সে পথ পায়। যে বোঝে না, সে পানির পাশে বসেও তৃষ্ণায় মরে।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default