কেন ইরান বিজয়ের পথে?

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

কেন ইরান বিজয়ের পথে?

আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল রণক্ষেত্রের ক্ষেপণাস্ত্র বা ট্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার লড়াই। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে আমেরিকা ও ইসরাইলের উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইরানের বিজয় লাভের সম্ভাবনা তিনটি মৌলিক কারণে অত্যন্ত জোরালো।

১. আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনবিক্ষোভ ও "No Kings" আন্দোলন

যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রধান শর্ত হলো দেশের জনগণের নৈতিক সমর্থন। বর্তমানে আমেরিকার রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের "No Kings" স্লোগান এবং যুদ্ধবিরোধী মিছিল ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাঁপিয়ে দিয়েছে। যখন একটি গণতান্ত্রিক দেশের সাধারণ মানুষ নিজের সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তখন সেই দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, দেশের ভেতরে জনঅসন্তোষ সামাল দিয়ে বাইরের যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। আমেরিকার এই অভ্যন্তরীণ ফাটল ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।

২. ভৌগোলিক সুবিধা ও বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান যদি এই জলপথটি আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ন্ত্রণ বা অবরুদ্ধ করতে পারে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। আমেরিকা বা ইসরাইল ইরানের ভেতরে আক্রমণ চালালে ইরান এই অর্থনৈতিক হাতিয়ারটি ব্যবহার করবে, যা পশ্চিমা বিশ্বের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। এই অর্থনৈতিক প্রভাব ইরানকে রণক্ষেত্রে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।

৩. অসম যুদ্ধের (Asymmetric Warfare) কৌশল

আমেরিকা ও ইসরাইল সরাসরি বা প্রথাগত যুদ্ধে অভ্যস্ত, কিন্তু ইরান গত কয়েক দশক ধরে অসম যুদ্ধের (Asymmetric Warfare) কৌশলে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সরাসরি সম্মুখ সমরে না এসেও ইরান তার শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রুকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে পারে। এই কৌশলে একটি ছোট শক্তি তার বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিশাল আমেরিকান বাহিনীকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করে তুলতে সক্ষম।

৪. জাতীয় ঐক্য ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

আক্রমণকারী দেশ হিসেবে আমেরিকার লক্ষ্য যেখানে অস্পষ্ট এবং নিজ দেশে বিতর্কিত, সেখানে ইরানের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ইতিহাস বলে, যখন কোনো জাতি তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একতাবদ্ধ হয়, তখন তারা যেকোনো বৃহৎ শক্তির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক প্রস্তুতি এবং আত্মরক্ষার দৃঢ় সংকল্প ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আকাশপথে হামলা চালিয়ে তাদের পুরোপুরি পরাস্ত করা প্রায় অসম্ভব।

যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তির চেয়েও 'ইচ্ছা' (Will to Fight) বড় শক্তি। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং ইরানের কৌশলগত অবস্থান প্রমাণ করছে যে, জনগণের ঘৃণা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ধস এড়িয়ে আমেরিকা বা ইসরাইলের পক্ষে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। পরিশেষে, এই রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটই ইরানকে বিজয়ের পথে এগিয়ে রাখছে।

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default