ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস। প্রথম পর্বঃ মাগরিবের আজান ও রহস্যময় ছায়া

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

ছদ্মবেশী ইমাম। কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস

পুরানো ঢাকার ঘিঞ্জি গলিগুলো তখন সন্ধ্যার আবছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। আকাশে গোধূলির শেষ রক্তিম আভা বিদায় নিচ্ছে। ঠিক এই সময়টায় শহরের কোলাহল একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। বায়তুল আমান জামে মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান ভেসে এল— আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার...

১৬ বছর বয়সী কিশোর জাওয়াদ আল-ফাহাদ তার ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে গুছিয়ে নিচ্ছিল। পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় গোল টুপি। জাওয়াদের চেহারা শান্ত, চোখে বুদ্ধির দীপ্তি। সমবয়সীদের কাছে সে একজন তুখোড় কোডিং এক্সপার্ট হিসেবে পরিচিত হলেও, তার আসল পরিচয় সে একজন শৌখিন গোয়েন্দা। তার মূল অস্ত্র হলো প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস

আজান শেষ হতেই জাওয়াদ মসজিদের দিকে পা বাড়াল। ওযু সেরে সে যখন কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াল, ঠিক তখনই তার পাশের লোকটির দিকে নজর গেল

লোকটি নতুন। পরনে ধবধবে সাদা জুব্বা, মাথায় সুন্দর করে পাগড়ি বাঁধা। দীর্ঘ দাড়ি আর নুরানি চেহারা। দেখতে একদম কোনো বড় আলেম বা বুজুর্গের মতো। কিন্তু জাওয়াদের অনুসন্ধিৎসু চোখ একটা অসংগতি ধরে ফেলল। লোকটির কবজিতে একটি দামি ঘড়ি, যার গায়ে খুব সূক্ষ্মভাবে একটা লোগো খোদাই করা। জাওয়াদ চেনে ওটা— ওটা একটি বিশেষায়িত মিলিটারি গ্রেড স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ঘড়ি। একজন সাধারণ ইমাম বা আলেমের হাতে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার কিছুটা অস্বাভাবিক

নামাজ শেষ হলো। জাওয়াদ লক্ষ্য করল, নতুন আসা এই 'ইমাম' সাহেব মোনাজাত শেষ করেই খুব দ্রুত মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণত আলেমরা নামাজের পর কিছুক্ষণ তসবিহ পড়েন বা মুসল্লিদের সাথে কথা বলেন। কিন্তু এই লোকটির মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করছে

জাওয়াদ নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিল

মসজিদের পেছনের সরু গলি দিয়ে লোকটি হাঁটছে। জাওয়াদ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এগোচ্ছে। হঠাৎ লোকটি একটি পুরনো জীর্ণ দালানের সামনে থামল। চারপাশটা একদম নির্জন। কেবল ডাস্টবিনের পাশে একটা বিড়াল ডেকে উঠল

লোকটি পকেট থেকে একটা ছোট ডিভাইস বের করল। নীল রঙের আলো জ্বলে উঠল তার হাতের তালুতে। জাওয়াদ দেয়ালের আড়ালে গা ঢাকা দিল। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। সে বিড়বিড় করে পড়ল— "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল" (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ কর্মবিধায়ক)

হঠাৎ লোকটির কান খাড়া হলো। সে বিদ্যুৎবেগে পেছনে ফিরে তাকাল। জাওয়াদ নিঃশ্বাস বন্ধ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল। লোকটি কি তাকে দেখে ফেলেছে?

ঠিক তখনই লোকটির কানে লাগানো ছোট একটা ইয়ারপিসে খসখসে শব্দ শোনা গেল। হিব্রু বা অন্য কোনো অপরিচিত ভাষায় সে দ্রুত কিছু একটা বলল। জাওয়াদ তার পকেট থেকে নিজের কাস্টমাইজড ফোনটা বের করে একটি সিগন্যাল জ্যামার অ্যাপ চালু করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগেই লোকটি দালানের ভেতরে ঢুকে পড়ল

জাওয়াদ পা টিপে টিপে দালানের ভাঙা দরজার কাছে পৌঁছাল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসছে। হঠাৎ উপর তলা থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ হলো। তারপরই শোনা গেল ধস্তাধস্তির শব্দ

জাওয়াদ সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে উপরে উঠতে লাগল। কাঠের সিঁড়িগুলো মড়মড় করে শব্দ করছে। তিনতলার ঘরে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে। জাওয়াদ দরজার ফুটো দিয়ে ভেতরে যা দেখল, তাতে তার রক্ত হিম হয়ে এল

ভেতরে সেই 'ইমাম' সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তার হাতে এখন তসবিহ নয়, বরং একটি অত্যাধুনিক লেজার গান। তার সামনে চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন ডক্টর আশরাফ— দেশের শীর্ষস্থানীয় নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট এবং জাওয়াদের বাবার পুরনো বন্ধু

"আপনার কাছে শেষ সুযোগ ডক্টর," লোকটি শীতল কণ্ঠে বলল। তার গলার স্বর এখন আর আগের মতো বিনয়ী নয়, বরং হিংস্র। "সেই প্রাচীন পাণ্ডুলিপির কোডটা আমাদের দিয়ে দিন, নতুবা এই পুরো শহর আজ রাতে এক বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হবে।"

জাওয়াদ বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ চুরি নয়। এটা উম্মাহর ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্র। সে তার ল্যাপটপ বের করতে যাবে, এমন সময় তার ঠিক পেছনে কেউ একজন ভারী বুট জুতো দিয়ে শব্দ করল

পেছন ফিরতেই জাওয়াদ দেখল, আরও একজন দীর্ঘদেহী লোক কালো মাস্ক পরে তার দিকে পিস্তল তাক করে আছে

"খেলা শেষ, পিচ্চি গোয়েন্দা," লোকটা কর্কশ গলায় বলল

জাওয়াদের সামনে এখন সাক্ষাৎ মৃত্যু। পালানোর কোনো পথ নেই। তিনতলার জানালা দিয়ে নিচে লাফ দেওয়া মানেই মৃত্যু নিশ্চিত। আর সামনে যমদূত

জাওয়াদ কি পারবে এই ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে এবং ডক্টর আশরাফকে বাঁচাতে? এই ছদ্মবেশী মোসাদ চরের আসল পরিকল্পনা কী?

পরবর্তী অধ্যায়ে আসছেঃ অন্ধকারের আক্রমণ ও একটি অসম লড়াই

[এই উপন্যাসে বর্ণিত সকল চরিত্র, স্থান এবং ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কাহিনীর প্রয়োজনে কিছু গোয়েন্দা কৌশল ও প্রযুক্তির উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে রচিত। গল্পের অলঙ্করণে ব্যবহৃত ফিচার ইমেজের কোনো চরিত্রের সাথে যদি কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির চেহারার মিল পাওয়া যায়, তবে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। লেখক কোনো উগ্রতা বা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেন না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরাই এই গল্পের মূল লক্ষ্য।]

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default