রমজানে খাদ্যে ভেজালঃ তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক বিপর্যয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
রমজানে খাদ্যে ভেজালঃ তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক বিপর্যয়

পবিত্র রমজান মাস মুমিনের জীবনে আত্মিক বসন্ত। এটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্য ও 'তাকওয়া' অর্জনের এক অনন্য সোপান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের বর্তমান সমাজে এই রহমতের মাসেই অসাধু ব্যবসায়ী ও অতি-মুনাফালোভীদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছায়। চাল, ডাল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ—সবখানেই আজ ভেজালের রাজত্ব। ১৮ কোটি মানুষের এই জনপদ আজ এক নীরব বিষক্রিয়ার শিকার। যে মাসে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হওয়ার কথা, সেই মাসেই পেট ভরে বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি কেবল স্বাস্থ্যের ক্ষতি নয়, বরং আধ্যাত্মিকতার মূলে কুঠারাঘাত।

কুরআনিক দলিল ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে হালাল ও পবিত্র রিজিক গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেনঃ
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
(সূরা আল-বাকারা, আয়াতঃ ১৬৮)
অনুবাদ: হে মানবমণ্ডলী! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা ভক্ষণ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাঃ এখানে 'তাইয়্যেবা' বা পবিত্র শব্দের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কোনো খাদ্য কেবল শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল (যেমন: মুরগি বা মাছ) হলেই চলে না, তা হতে হবে 'তাইয়্যেব' বা গুণগতভাবে উৎকৃষ্ট ও নিরাপদ। খাদ্যে ভেজাল মেশানো মূলত শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। কারণ শয়তান মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সাময়িক লাভের প্রলোভন দেখায়। যখন কোনো মানুষ ভেজালযুক্ত খাবার খায়, তখন তার রক্ত ও কোষসমূহ সেই অপবিত্রতায় গঠিত হয়। ফলে তার ইবাদতে একাগ্রতা থাকে না এবং দোয়া কবুল হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

হাদিসের আলোকবর্তিকা
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও ওজনে কম দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে একে নিষিদ্ধ করেছেন। সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছেঃ
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০১)
অনুবাদঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রতারণা (বা ভেজাল) করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।"
এই হাদিসটি অত্যন্ত ভীতিকর। যে ব্যক্তি খাদ্যে বিষ মিশিয়ে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে, প্রিয়নবী (সা.) তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন। কাপড়ে ব্যবহৃত রং খাবারে মেশানো কিংবা ফল পাকাতে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা স্পষ্টত প্রতারণা। একজন মুমিন কখনোই অন্যের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে না।

তাকওয়া ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা
রমজান মাসে কেন খাদ্যে ভেজালের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়? এর মূল কারণ হলো 'তাকওয়া' বা আল্লাহভীতির অভাব। মানুষ যখন পরকালের জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায়, তখন সে দুনিয়াবি লাভের জন্য অন্ধ হয়ে পড়ে। আজ অভিজাত রেস্টুরেন্ট থেকে ফুটপাতের দোকান—সবখানেই যেন লাভের প্রতিযোগিতা।
নীরব ঘাতকঃ মাছ-মাংস সতেজ রাখতে ফরমালিন এবং ফল পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মূলত একটি ধীরগতির হত্যাযজ্ঞ।
শিশুখাদ্য ও ওষুধঃ যখন শিশুখাদ্য ও ওষুধে ভেজাল মেশানো হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।
রমজানের অবমাননাঃ রমজান হলো সংযমের মাস। অথচ এই মাসে ইফতারি সাজানো হয় বাহারি রঙের বিষাক্ত খাবার দিয়ে। এটি সিয়ামের মূল স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, "হারাম খাদ্যে গঠিত শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মিশকাত)। সুতরাং যারা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে মুনাফা লুটছে, তারা মূলত নিজেদের জন্য জাহান্নামের আগুন সঞ্চয় করছে।

আহলুল বাইয়েত (আ.)-এর জীবনদর্শন ও তাসাউফ
আহলুল বাইয়েতের (আ.) পবিত্র জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে হালাল রুজির প্রতি যত্নশীল হতে হয়। মাওলা আলী (আ.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছেঃ
"পেটকে পশুদের কবরস্থান বানিও না এবং সন্দেহযুক্ত খাবার থেকে নিজেকে দূরে রাখো।"

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ব্যবসায়িক সততা সম্পর্কে বলতেন যে, আল্লাহর কাছে সেই ব্যবসায়ী প্রিয় যে মানুষের প্রয়োজনে সহজতা তৈরি করে, কৃত্রিম সংকট বা প্রতারণা করে না। 'হাদিসে সাকালাইন'-এর চেতনা হলো কুরআন এবং আহলুল বাইয়েতের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। আহলুল বাইয়েতের আদর্শে দেখা যায়, তারা শুকনো রুটি খেয়ে দিন অতিবাহিত করতেন কিন্তু কখনো সন্দেহজনক বা অন্যের হক নষ্ট করে এমন খাবার গ্রহণ করতেন না।

সুফিবাদে 'লুকমায়ে হালাল' বা হালাল গ্রাসের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বলতেন, "অশুদ্ধ খাদ্য মানুষের কলব বা হৃদয়কে অন্ধকার করে দেয়।" ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর 'এহয়াউ উলুমিদ্দীন' গ্রন্থে লিখেছেন যে, শয়তান মানুষের রক্তপ্রবাহের সাথে মিশে যায়, আর সেই রক্ত যদি হারাম ও বিষাক্ত খাবারে তৈরি হয়, তবে নফস বা রিপু শক্তিশালী হয়ে পড়ে। রুমি ও শামস তাবরিজির দর্শনে 'ইশক' বা প্রেম অর্জনের প্রথম শর্তই হলো শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা। বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত খাবার মানুষের স্নায়বিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে ভোঁতা করে দেয়।

আধ্যাত্মিক বার্তা
খাদ্যে ভেজাল কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, এটি একটি কবিরা গুনাহ এবং মানবিকতাবিরোধী কাজ। প্রশাসন ও সরকারের উচিত কঠোর তদারকির মাধ্যমে এই বিষাক্ত চক্র ভেঙে ফেলা। তবে সবার আগে প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা ও ঈমানি জাগরণ।

হে মানুষ! মনে রেখো, তোমার এই শরীর আল্লাহর আমানত। আর তোমার রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। ধোঁকা দিয়ে উপার্জিত অর্থ তোমার বংশধরের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। এই রমজানে আসুন আমরা শপথ করি, আমরা কেবল তাই খাব যা পবিত্র এবং তাই বিক্রি করব যা নিরাপদ। প্রকৃত রোজা তখনই সার্থক হবে, যখন আমাদের উপার্জন হবে স্বচ্ছ এবং খাদ্য হবে বিশুদ্ধ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে 'তাইয়্যেব' রিজিক অন্বেষণ করার এবং অন্তরের 'তাকওয়া' অর্জন করার তৌফিক দান করুন।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default