সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল তার রেভিউন্যু বা প্রযুক্তির উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে তার 'মানব সম্পদ' বা হিউম্যান ক্যাপিটালের ওপর। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (HRM) হলো সেই প্রাতিষ্ঠানিক কৈৗশল বা কাঠামো, যা এই পুঁজিকে বিকশিত করে। তবে এর মূলে রয়েছে একটি গভীর নৈতিক দ্বান্দ্বিকতা। নৈতিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো সততা, ন্যায্যতা এবং মানবিক মর্যাদার সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রশাসনিক কাঠামো। অন্যদিকে, অনৈতিক ব্যবস্থাপনা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শ্রমের শোষণের এক যান্ত্রিক রূপ। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব অর্জন করতে পারে না; বরং অনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।
নীতি ও অনীতির বিশ্লেষণ
মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার গভীরে লুকিয়ে থাকে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মনস্তাত্ত্বিক চুক্তির দর্শন।নৈতিক ব্যবস্থাপনাঃ এটি প্রতিটি কর্মীকে কেবল একটি 'রিসোর্স' বা উপকরণ হিসেবে দেখে না, বরং একজন মানুষ হিসেবে গণ্য করে। এখানে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর মূল ভিত্তি হলো 'Equitable Justice' বা সমতাভিত্তিক বিচার।
অনৈতিক ব্যবস্থাপনাঃ এটি স্বার্থান্বেষী এবং বৈষম্যমূলক। যখন স্বজনপ্রীতি (Nepotism), লিঙ্গ বৈষম্য, বা অযৌক্তিক কাজের চাপ কর্মীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা অনৈতিকতায় রূপ নেয়। এটি মূলত ম্যাকিয়াভেলিয়ান দর্শনের প্রতিফলন, যেখানে লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো উপায় অবলম্বন করাকে বৈধ মনে করা হয়। এই সংঘাত আদতে মানবিক মূল্যবোধ বনাম যান্ত্রিক লালসার সংঘাত।
বিশ্বাসের সেতুবন্ধন
একটি প্রতিষ্ঠানকে যদি একটি সজীব বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয়, তবে 'মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা' হলো সেই বৃক্ষের মূল বা শিকড়।শিকড় ও বিষাক্ততাঃ নৈতিকতা হলো সেই লিকুইড যা বৃক্ষকে পুষ্টি দেয়। বিপরীতে, অনৈতিক চর্চা হলো সেই পরজীবী বা বিষাক্ত কীট, যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান না হলেও ভেতর থেকে কাণ্ডকে কুরে কুরে খেয়ে ফাপা করে দেয়।
আয়না ও প্রতিচ্ছবিঃ এইচআরএম (HRM) হলো প্রতিষ্ঠানের নৈতিক আয়না। যদি এই আয়না ধুলোবালি বা দুর্নীতির ছোপে ঢাকা পড়ে, তবে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হয়। এখানে 'স্বচ্ছতা' কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি শৈল্পিক বুনন যা মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে বিশ্বাসের সেতুবন্ধন তৈরি করে।
অনৈতিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিণাম ভয়াবহ এবং বহুমুখী।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ও ধ্বংসের স্বরূপঃ
১. মেধা পাচার (Brain Drain): যোগ্য কর্মীরা যখন দেখেন যে মেধার চেয়ে তোষামোদি বা অনৈতিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন তারা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন।
২. সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ঃ অনৈতিকতা একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো। যখন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অনৈতিক হন, তখন নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ফাঁকিবাজি এবং দুর্নীতির প্রবণতা বেড়ে যায়।
৩. আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিঃ বৈষম্য বা হয়রানির কারণে প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে পারে, যা কেবল অর্থদণ্ড নয়, বরং দীর্ঘদিনের অর্জিত ব্র্যান্ড ভ্যালু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
নৈতিকতার সুফল ও উন্নয়নঃ
বিপরীতে, নৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের 'Organizational Citizenship Behavior' বৃদ্ধি করে। কর্মীরা প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনে করতে শুরু করেন। এটি সৃজনশীলতা বাড়ায় এবং উৎপাদনশীলতাকে একটি গাণিতিক হারের চেয়েও বেশি উচ্চতায় নিয়ে যায়। বর্তমানের 'ESG' (Environmental, Social, and Governance) যুগে নৈতিক এইচআরএম-ই বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
অনৈতিকতা শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের উপায়ঃ
অনৈতিকতা শনাক্ত করার জন্য প্রতিষ্ঠানের 'Whistleblowing' বা গোপন অভিযোগ প্রদানের শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকা জরুরি। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির অস্বাভাবিক দ্রুত পদোন্নতি ঘটে বা কর্মীদের মধ্যে উচ্চ হারে চাকরি ছাড়ার (High Attrition Rate) প্রবণতা দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে সেখানে অনৈতিকতার বীজ বপন করা হয়েছে। এটি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা এবং 'Code of Ethics'-এর কঠোর প্রয়োগ। নেতৃত্বের স্তরে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ছাড়া কেবল নিয়ম দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা কেবল কিছু নথিপত্র বা বেতন কাঠামোর হিসাব নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের বিবেক। অনৈতিকতা সাময়িক মুনাফা দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। একটি সুস্থ, সবল এবং দীর্ঘজীবী প্রতিষ্ঠানের প্রাণভোমরা লুকিয়ে থাকে তার ন্যায়পরায়ণ আচরণের মধ্যে। মানুষের শ্রম ও মেধার যথাযথ সম্মান প্রদর্শনই হোক আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির শেষ কথা। মনে রাখা প্রয়োজন, যন্ত্রকে তেল দিয়ে সচল রাখা যায়, কিন্তু মানুষকে সচল রাখতে প্রয়োজন শ্রদ্ধা ও নৈতিকতার জ্বালানি।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।